musarboijatra 's Reviews > পথের দাবী
পথের দাবী
by
by
'পথের দাবী' আমার জন্য ছিল তেমন আরেকটা উপন্যাস, যেটা সামনে থাকা সত্ত্বেও হাতে নেওয়া হয়নি উপযুক্ত রিভিউ পাইনি বলে। দুর্দান্ত! ক্ল্যাসিক উপন্যাসে নারীবাদ, আন্দোলন, সামাজিক গল্প এত রকম দিক থাকবে প্রত্যাশা করিনি। এবং 'দেবদাস, 'বড়দিদি' পড়ে শরৎচন্দ্র-কে যেমন চিনেছিলাম, তাঁর কাছ থেকে এমন 'পলিটিকালি কন্সার্নড' লেখা আমার জন্য ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত!
উপন্যাসে রাজনৈতিক সোচ্চারতা যাঁদের পড়তে পছন্দ, এবং কোনো একসময় Ban হওয়া বই পেলেই যাঁদের আগ্রহ বেড়ে যায়, তেমন বাঙালী পাঠকদের অবশ্যই পথের দাবী পড়া উচিৎ! ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হওয়ার পরের বছরেই ব্রিটিশ রাজ-রোষের মুখে বাজেয়াপ্ত হয় বইটি, এমন একটা সময়ে, যখন ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলন তুঙ্গে। বঙ্গবাণী পত্রিকায় ধারাবাহিক পত্রিকায় প্রকাশের সময় থেকেই সরকারি মহলে বিষোদগার শুরু হয় উপন্যাসটি নিয়ে, শেষে সরকারি গেজেটে তাকে নিষিদ্ধ করা... তারপরেও এই নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে বেশ আন্দোলন হয়েছিল জনতার মাঝে।
কর্মসূত্রে রেঙ্গুনে আসে বাঙালী ব্রাহ্মণ ছেলে অপূর্ব, যে আগাগোড়া সংস্কারের প্রতিভূ। ঘটনা-দুর্ঘটনায় পরিচয় হয় ভারতী'র সঙ্গে, যে ব্রাহ্মণ মেয়ে বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সঙ্গে এখন এক ইংরেজের পরিবারে আশ্রিত, ধর্ম পাল্টে হয়েছেন মিস ভারতী গোমেজ। যে অপূর্ব'র ভীষণ সংস্কারে কিনা ভারতীর হাতে জল খেলেও জাত যেতে পারে, সে অপূর্ব-ই অবস্থার ফেরে রীতিমতো নির্ভরশীল হয়ে পড়ে ভারতীর ওপর। এই অব্দি ধর্মীয় সংস্কারকে চ্যালেঞ্জ করে একটা সামাজিক ও রোমান্টিক গল্প বলতে পারতেন শরৎচন্দ্র, কিন্তু এরপর থেকেই গল্পের রাজনৈতিক সচেতনতা সামনে প্রকাশ পায়। ইতিমধ্যে রেঙ্গুনের ইংরেজ মুল্লুকে বিরাজমান ইংরেজ-প্রভাবিত বৈষম্যের ছবি পাঠক দেখতে পেয়েছে অপূর্ব'র চোখে। এবার ভারতীর সাথে গিয়ে পরিচিত হয় সমাজকে পাল্টাবার এক সংগঠনের সাথে, যার নাম 'পথের দাবী'।
'পথের দাবী' মূলত সমাজ সংস্কার এবং শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে, দরিদ্র শিশুদের শিক্ষাবিস্তারেও। শ্রমিকের পাশে এসে দাঁড়ানোর মাঝে হয়তো কিছুটা কম্যুনিস্ট ভাবধারা প্রকাশ পায়। কিন্তু সমিতি'র গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক, 'ডাক্তারবাবু', পুরোদস্তুর অ্যানার্কিস্ট, এবং শাসকদলের বিপক্ষে সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িত। সশস্ত্র সংগ্রামীরূপে দেখা যায় দলের অধিকাংশ সদস্যকেই। এ যে তৎকালীন অনুশীলন সমিতি এবং সশস্ত্র আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি, তা ধারণা করাই যায়। এমনকি পথের দাবী'র প্রকাশকাল মিলে যায় সূর্যসেন-এর তৎপরতার সময়ের সাথেও।
তাই পথের দাবী উপন্যাসের শুরুতে মূল চরিত্রে অপূর্ব আর ভারতীকে দেখতে পেলেও, অর্ধাংশ থেকে আমাদের নজর ঘুরে যায় ডাক্তারবাবু'র দিকে। যাঁর কন্ঠে লেখক উচ্চারণ করেছেন পরাধীন ভারতকে স্বাধীন করার মন্ত্র, কাহিনীতে যাঁর উপস্থিতি, সংলাপ, কাজ যেন শরৎচন্দ্রের লেখা মেনিফেস্টো। তবু এই চরমপন্থী বিপ্লবী চরিত্রকে তিনি হিরো ওঅরশিপের চোখে দেখেননি, সমালোচনা করেছেন আশপাশের চরিত্রগুলোর হাতে। এভাবেই ভারতী বা সুমিত্রা'র মতো শক্তিশালী নারী চরিত্রগুলো উজ্জ্বল ছিলেন নিজ জায়গায়। শক্ত প্রশ্নটা করেছেন সুমিত্রা, যিনি হতে পারতেন ডাক্তারের সংক্ষুব্ধ জীবনের একমাত্র ঠাঁই, প্রশ্ন করেছেন এই ধ্বংসাত্মক জীবনযাত্রায় আসলে মনুষ্যত্ব টিকে থাকতে পারে কি না। একেকটা চরিত্র'র একেকটা গল্প এঁকেছেন লেখক, কিন্তু শেষে অধিকাংশকেই সম্পূর্ণ character arc দেননি, যেন তাদের গল্পের চাইতে গুরুতর ছিল তাদের উপস্থিতিতে যে রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরেছেন লেখক, সেটা।
পথের দাবী ভীষণ Politically Opinionated একটা উপন্যাস, এবং বলা বাহুল্য, এর লেখক আমার এতদিনকার চেনা শরৎচন্দ্রের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনে যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা আছে, 'পথের দাবী' তেমন প্রভাব রেখেছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে হয়।
পুনশ্চ : ১৯৭৭ সালে উত্তম কুমারকে নায়ক করে 'পথের দাবী'র সিনেমা এডাপ্টেশন হয়, সব্যসাচী নামে। পরিচালনায় ছিলেন পীযুষ বোস।
উপন্যাসে রাজনৈতিক সোচ্চারতা যাঁদের পড়তে পছন্দ, এবং কোনো একসময় Ban হওয়া বই পেলেই যাঁদের আগ্রহ বেড়ে যায়, তেমন বাঙালী পাঠকদের অবশ্যই পথের দাবী পড়া উচিৎ! ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হওয়ার পরের বছরেই ব্রিটিশ রাজ-রোষের মুখে বাজেয়াপ্ত হয় বইটি, এমন একটা সময়ে, যখন ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলন তুঙ্গে। বঙ্গবাণী পত্রিকায় ধারাবাহিক পত্রিকায় প্রকাশের সময় থেকেই সরকারি মহলে বিষোদগার শুরু হয় উপন্যাসটি নিয়ে, শেষে সরকারি গেজেটে তাকে নিষিদ্ধ করা... তারপরেও এই নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে বেশ আন্দোলন হয়েছিল জনতার মাঝে।
কর্মসূত্রে রেঙ্গুনে আসে বাঙালী ব্রাহ্মণ ছেলে অপূর্ব, যে আগাগোড়া সংস্কারের প্রতিভূ। ঘটনা-দুর্ঘটনায় পরিচয় হয় ভারতী'র সঙ্গে, যে ব্রাহ্মণ মেয়ে বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সঙ্গে এখন এক ইংরেজের পরিবারে আশ্রিত, ধর্ম পাল্টে হয়েছেন মিস ভারতী গোমেজ। যে অপূর্ব'র ভীষণ সংস্কারে কিনা ভারতীর হাতে জল খেলেও জাত যেতে পারে, সে অপূর্ব-ই অবস্থার ফেরে রীতিমতো নির্ভরশীল হয়ে পড়ে ভারতীর ওপর। এই অব্দি ধর্মীয় সংস্কারকে চ্যালেঞ্জ করে একটা সামাজিক ও রোমান্টিক গল্প বলতে পারতেন শরৎচন্দ্র, কিন্তু এরপর থেকেই গল্পের রাজনৈতিক সচেতনতা সামনে প্রকাশ পায়। ইতিমধ্যে রেঙ্গুনের ইংরেজ মুল্লুকে বিরাজমান ইংরেজ-প্রভাবিত বৈষম্যের ছবি পাঠক দেখতে পেয়েছে অপূর্ব'র চোখে। এবার ভারতীর সাথে গিয়ে পরিচিত হয় সমাজকে পাল্টাবার এক সংগঠনের সাথে, যার নাম 'পথের দাবী'।
'পথের দাবী' মূলত সমাজ সংস্কার এবং শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে, দরিদ্র শিশুদের শিক্ষাবিস্তারেও। শ্রমিকের পাশে এসে দাঁড়ানোর মাঝে হয়তো কিছুটা কম্যুনিস্ট ভাবধারা প্রকাশ পায়। কিন্তু সমিতি'র গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক, 'ডাক্তারবাবু', পুরোদস্তুর অ্যানার্কিস্ট, এবং শাসকদলের বিপক্ষে সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িত। সশস্ত্র সংগ্রামীরূপে দেখা যায় দলের অধিকাংশ সদস্যকেই। এ যে তৎকালীন অনুশীলন সমিতি এবং সশস্ত্র আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি, তা ধারণা করাই যায়। এমনকি পথের দাবী'র প্রকাশকাল মিলে যায় সূর্যসেন-এর তৎপরতার সময়ের সাথেও।
তাই পথের দাবী উপন্যাসের শুরুতে মূল চরিত্রে অপূর্ব আর ভারতীকে দেখতে পেলেও, অর্ধাংশ থেকে আমাদের নজর ঘুরে যায় ডাক্তারবাবু'র দিকে। যাঁর কন্ঠে লেখক উচ্চারণ করেছেন পরাধীন ভারতকে স্বাধীন করার মন্ত্র, কাহিনীতে যাঁর উপস্থিতি, সংলাপ, কাজ যেন শরৎচন্দ্রের লেখা মেনিফেস্টো। তবু এই চরমপন্থী বিপ্লবী চরিত্রকে তিনি হিরো ওঅরশিপের চোখে দেখেননি, সমালোচনা করেছেন আশপাশের চরিত্রগুলোর হাতে। এভাবেই ভারতী বা সুমিত্রা'র মতো শক্তিশালী নারী চরিত্রগুলো উজ্জ্বল ছিলেন নিজ জায়গায়। শক্ত প্রশ্নটা করেছেন সুমিত্রা, যিনি হতে পারতেন ডাক্তারের সংক্ষুব্ধ জীবনের একমাত্র ঠাঁই, প্রশ্ন করেছেন এই ধ্বংসাত্মক জীবনযাত্রায় আসলে মনুষ্যত্ব টিকে থাকতে পারে কি না। একেকটা চরিত্র'র একেকটা গল্প এঁকেছেন লেখক, কিন্তু শেষে অধিকাংশকেই সম্পূর্ণ character arc দেননি, যেন তাদের গল্পের চাইতে গুরুতর ছিল তাদের উপস্থিতিতে যে রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরেছেন লেখক, সেটা।
পথের দাবী ভীষণ Politically Opinionated একটা উপন্যাস, এবং বলা বাহুল্য, এর লেখক আমার এতদিনকার চেনা শরৎচন্দ্রের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনে যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা আছে, 'পথের দাবী' তেমন প্রভাব রেখেছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে হয়।
পুনশ্চ : ১৯৭৭ সালে উত্তম কুমারকে নায়ক করে 'পথের দাবী'র সিনেমা এডাপ্টেশন হয়, সব্যসাচী নামে। পরিচালনায় ছিলেন পীযুষ বোস।
Sign into Goodreads to see if any of your friends have read
পথের দাবী.
Sign In »
Reading Progress
Comments Showing 1-1 of 1 (1 new)
date
newest »
newest »
message 1:
by
Priyanka
(new)
-
rated it 5 stars
Nov 25, 2025 07:59PM
খুব সুন্দর রিভিউ
reply
|
flag

